ভাসমান সেতুর কারিগর কে এই রবিউল ইসলাম?

অভাব-অনটনের কারণে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। পুঁথিগত বিদ্যার জোর তেমন নেই। তাতে কী মেধার জোর তো আছে। এই মেধা আর চেষ্টার জোরেই তিনি তৈরি করে ফেললেন দেশের দীর্ঘতম ভাসমান সেতু। স্বশিক্ষিত এই প্রকৌশলীর নাম রবিউল ইসলাম।

তিনি যে কাজটি করেছেন, তার খবর অনেকের জানা। বলছিলাম গ্রামবাসীর উদ্যোগে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জের ঝাঁপা গ্রামে ভাসমান সেতুটির কথা।

প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর লোহার অ্যাঙ্গেল ও পাত বসিয়ে তৈরি সেতুটি লম্বায় এক হাজার ফুট। যে সেতু গোটা জনপদের দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। দুই পারের ৯ গ্রামের মানুষের পারাপারের দুর্ভোগ কমিয়েছে। ওই সেতুর কারিগর রবিউল ইসলাম। ভাসমান সেতুটির পাশে টাঙানো সাইনবোর্ডেও সেতু তৈরির কারিগর হিসেবে লেখা রয়েছে তাঁর নাম।
রবিউল ইসলামের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ এলাকার অজপাড়ায়। তিনি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তখন আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে লেখাপড়ার পাট চুকাতে হয়।

এরপর কাজ নেন লেদ মেশিনের দোকানে। সেখানেই দীর্ঘদিন কাজ শেখেন। শেখার পর বাবার দেওয়া ৫০ হাজার টাকায় একটি লেদ মেশিন কিনে নিজেই দোকান দেন। ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার যান, ট্রলিসহ বিভিন্ন যানের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করতেন।

রবিউলের দোকানটি এখন রাজগঞ্জ বাজারে। প্রতিষ্ঠানের নাম বিশ্বাস ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। হালকা প্রকৌশল শিল্পের ওই প্রতিষ্ঠানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এই ১০ জনকে নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ভাসমান সেতুটি। সময় লেগেছে পাঁচ মাস।

রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সেতুটি তৈরির জন্য প্রথম এক মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। এরপর আমার প্রতিষ্ঠানের ১০ জন শ্রমিক নিয়ে চার মাস ধরে সেতু নির্মাণের কাজ করি। অর্থের জন্য নয়, সুনামের জন্যই কাজটি করেছি। এখানে লাভ-লোকসানের হিসাব নেই।’

সেতুটি নির্মাণের জন্য ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। তবে রবিউল ইসলাম যে শ্রম দিয়েছেন, তার মূল্য আরও অনেক বেশি বলে তিনি মনে করেন। শুধু গ্রামের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার কথা ভেবেই তিনি কাজটি করেছেন।

সেতুর মূল কাজ শুরুর আগে লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর ২০ ফুটের মতো সেতু বানানো হয়। সেটার ওপর প্রায় ৩২ জন মানুষ উঠে দেখেছেন সেটি ডোবে কি না। পরীক্ষা সফল হলো। এরপরই শুরু হয় মূল কাজ।

রবিউল ইসলাম সেতু নির্মাণের কাজ করলেও ভাসমান সেতুর মূল বিষয়টি প্রথম মাথায় আসে ঝাঁপা গ্রামের মো. আসাদুজ্জামানের। আসাদুজ্জামানেরও প্রকৌশলগত কোনো শিক্ষা নেই।

ঝাঁপার ওই বাঁওড়ের পানিতে প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর দুটি ভারী শ্যালো মেশিন বসিয়ে কয়েকজন বালু উত্তোলন করছিলেন। সেটা দেখেই ভাসমান সেতুর চিন্তা আসে তাঁর মাথায়।

আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের কারোরই কারিগরি জ্ঞান নেই। “গাইতে গাইতে গায়েন”-এর মতো নিজেদের মাথা খাটিয়ে কাজটি করেছি। তবে মূল কাজটি করেছে রবিউল।’

নতুন বছরের প্রথম দিনেই ভাসমান সেতুটি উদ্বোধন করা হয়েছে। ৮ ফুট চওড়া ও ১ হাজার ফুট লম্বা সেতুটি তৈরিতে ৮০০টি প্লাস্টিকের ড্রাম, ৮০০ মণ লোহার অ্যাঙ্গেল ও ২৫০টি লোহার শিট ব্যবহার করা হয়েছে।

সেতুর দুই প্রান্তে শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যাওয়া ৩০০ ফুট অংশ বাঁশের চরাট দিয়ে সংযোগ সেতু তৈরি করা হয়েছে। রবিউলের তৈরি সেতুর ওপর দিয়ে এখন ভ্যান, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলসহ মানুষ অনায়াসে পারাপার হচ্ছে।

-প্রথম আলো

Hits: 17

Facebook Comments

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!