দুই মেয়ে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে যেখানে গেলেন একরামুলের স্ত্রী!

সম্প্রতি মাদক বিরোধী অভিজানে নিহত হয়েছেন টেকনাফের উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক। এ নিয়ে সামাজিক মধ্যম এবং সারা দেশ ব্যাপী চলছে আলোচনা সমালোচনা।

এখন দেখা জায় একরামুল হকের নাফ হোটেল সংলগ্ন বাসাভবনে এখন তালা ঝুলছে। নিহত একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম তার স্কুল পড়ুয়া দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে ঘরছাড়া হয়েছেন।

পরিবারের কর্তার আচমকা প্রাণহানির পর থেকে দুই কন্যা তাহিয়া হক ও নাহিয়ান হককে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা আয়েশা বেগম সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে টেকনাফ ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে এসেছেন। চট্টগ্রামের একটি বাসায় তারা নিজেদের লুকিয়ে রয়েছেন।

অনেক চেষ্টার পর ফোনে আয়েশা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গত চারদিন ধরে দুই মেয়ে নিয়ে চট্টগ্রামে মায়ের ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন। তারা এখনো শোকে মূহ্যমান। বাবাকে হারানোর পর এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি তাদের অষ্টম শ্রেণি ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই মেয়ে। মুছেনি তাদের চোখের পানি। বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে এখন তারা শয্যাশায়ী।

টেকানাফের বাড়ি ছেড়ে চট্টগ্রামে আসার কারণ জানতে চাইলে আয়েশা বেগম, টেকনাফে বাড়িতে থাকার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ঘরে দুই মেয়ে আর আমি ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই। নানাজন এসে নানারকম কথা বলছে। এসব কথা শোনার মতো মানসিক শক্তি আমার নেই। সব মিলিয়ে ওই বাড়িতে অসহায় লাগছিল। নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা মেয়েদের নিয়ে চট্টগ্রামে এসে লুকিয়ে আছি।

নিহত স্বামী একরাম ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত ছিল না, আর তাকে ইয়াবা কারবারি সন্দেহ হত্যা করা হয়নি উল্লেথ করে আয়েশা বলেন, মেরিন ড্রাইভ সড়কে অবৈধভাবে জায়গা জবরদখলের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন কাউন্সিলর। এ ঘটনাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে প্রভাবশালীরা তার বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করে।

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো দিন মামলা-মোকদ্দমার ধারে কাছে যায়নি। মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে যে থানা-আদালতে দৌড়াদৌড়ি করব, সেই সুযোগ ও পরিস্থিতি কোনোটি নেই। মেয়ে দুটো সারাক্ষণ বাবার জন্য কান্নাকাটি করছে, ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যাচ্ছে, কী করব ভেবে পাচ্ছি না। দুই মেয়ের লেখাপড়ার কী হবে? কীভাবে সংসার চালাব ?

কান্নায় ভেঙে পড়ে আয়েশা বেগম বলেন, আমি কি করবো বা আমার কি করা উচিত, আমি বুঝতে পারছি না? কমিশনার (একরাম) তো যাওয়ার সময় আমাকে একটি টাকাও দিয়ে যাননি। আমি আমার দুই কন্যা নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? কী খাব, কিভাবে পড়ালেখা করাব ওদের?

আয়েশার প্রশ্ন, ইয়াবা ব্যবসায়ীর তকমা দিয়ে একরামুলকে হত্যা করা হলেও টেকনাফে কি আদৌ ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হবে? ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত আসল হোতাদের কি গ্রেপ্তার কিংবা আইনের আওতায় আনা হবে?

তিনি বলেন, ‘একরামুলকে হত্যার বিনিময়ে যদি টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত অঞ্চল ঘোষণা দেওয়া যেত, তবে মনকে কিছুটা সান্ত্বনা দিতে পারতাম। এখন সময় যত গড়াচ্ছে, হতাশা তত বাড়ছে। একরামুলকে হত্যা করে সরকারের মাদকবিরোধী সফল অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য সীমান্তের কেউ চক্রান্তে লিপ্ত ছিল কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।’

একরামের দুই মেয়ে তাহিয়াত হক ও নাহিয়ান হক টেকনাফ বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের অষ্টম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। তাহিয়াত জানায়, ‘বাবা সব সময় আমাদের মোটরসাইকেলে তুলে স্কুলে নিয়ে যেতেন, তখন তাঁর শরীর থেকে সুগন্ধ নাকে আসত। বাবা তো বেঁচে নেই, এখন কে আমাদের স্কুলে নিয়ে যাবে? সুগন্ধটা কোথায় পাব?’।

এদিকে একরামুল হক নিহতের আট দিন পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ফোন এসেছে বলে জানিয়েছেন আয়েশা বেগম। রবিবার বিকাল ৫টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার কাছে একটি ফোন আসে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তাকে ফোন করা হয়েছিল।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘যিনি ফোন করেছিলেন তার নাম-পরিচয় মনে নেই।’ তবে ফোনকারী নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জানিয়েছেন, ঘটনার বিস্তারিত জানতে আয়েশার সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে।

তিনি আরও জানান, গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাও তাকে ফোন করেন। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে তার (আয়েশা) সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে মন্ত্রণালয়।

পরে জানা জায়, কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একরামুলের স্ত্রীর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন।

Hits: 22

Facebook Comments

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!